মহারাজা তোমারে সেলাম

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তুখোড় একজন শিক্ষক একই সাথে মাস্টারি করে গেছেন সাহিত্য ও সিনেমার ইসকুলে।

বাবা সুকুমার রয়ের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের বারান্দায় পা। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা চলে গেলেন সিনেমার জগতে।

সিনেমাতে ঢুকেই বাঙলা সিনেমাকে সাবালক করে তুললেন। নিজের মতো করে কথা বলা শিখালেন।ছায়া ও মায়ার এই জগতকে ক্যামেরাবন্ধি করে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে আনলেন অবলীলায়।

পারিপার্শ্বিক পর্যবেক্ষণে তীক্ষ্ণধী!অসামান্য রসবোধ, অঙ্কনশৈলী,প্রচার ও পরিকল্পনা নিয়ে একা একা পেড়ুলেন অনেকটা পথ।

টালিপাড়াকে নিয়ে গেলেন অস্কারের মঞ্চে।বাংলা ভাষায় সিনেমা বানিয়ে বাগিয়ে আনলেন সিনেমা জগতের সব থেকে বড় স্বপ্নের পুরুষ্কার ‘অস্কার’ এওয়ার্ড।

ভারতীয় উপমহাদেশ আজ অবধি একমাত্র অস্কার।যা সমগ্র বাংলা ও বাঙালির একমাত্র গর্বের পুরুষ্কার।

সত্যজিৎ রায়কে হলিউডের বাঘা বাঘা পরিচালকরা তকমা দিলেন ‘সিনেম্যাটিক পোয়েট’।

বাজারে তখন একটা কথা খুব চাউর হলো “What Ray Thinks Today,India Thinks Tomorrow”

এই সিনেম্যাটিক পোয়েটের জার্নিটার প্রথম দিকটা বলতে গিয়ে তার ইন্টারভ্যু আমরা নিচের কথাগুলো শুনতে পাই।

সত্যজিৎ রায় তখন আটঘাট বেধে ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে নেমে পড়েছেন মাঠে।প্রডিউসার এলো। খুব মনযোগ দিয়ে গল্প শুনলো। প্রোডিউসার সাহেব প্রথমদিন চলেও গেলেন লোকেশন। তারপর কোলকাতায় ফিরে প্রোডিউসার দমে গেলেন।

সত্যজিৎ রয়কে ডেকে নিয়ে চাপা গলায় বললেন,’মিস্টার রয় এই গল্প কে দেখবে?রোমান্স নেই,ফাইট নেই।এটা কেমন ছবি? আপনি বরং অন্যকিছু করুন’ বলে হাঁটা দিলেন প্রোডিউসার।

সত্যজিৎ রয়ের তখন ফ্লিম কেনার পয়সা নেই।ছবি বানাতে হবে।হাতে প্রোডিউসার নেই। স্ত্রীর গয়না বন্ধক দিয়ে, বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে ধার দেনা করে শেষ করলেন বাংলা সিনেমার জগতের সেরা সিনেমা ‘পথের পাঁচালি’।

সত্যজিৎ রয়ের হাত ধরে বাঙলা সিনেমা পেল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী নায়কদের।

মুদ্রার এপিঠে বাংলা সিনেমা সমৃদ্ধ হলো হীরক রাজার দেশে,গুপি গায়েন বাঘা বাইন,অপরাজিত,চারুলতা,কাঞ্চনজঙ্ঘা,আগন্তুক,বিশ্বাসঘাতক,নায়ক এর র মতো সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা পেয়ে।

সক্রিয় রাজনীতির আঙিনা থেকে সচেতন ভাবেই দূরে বিচরণ করলেও একের পর অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক অভিঘাতের বিদ্রুপ , স্বচ্ছন্দ প্রকাশে দেখি গুপীগাইন বাঘা বাইনে , গণশত্রুর আত্মপ্রকাশে।

আপনাদের মনে আছে অপরাজিত’ ছবিতে আড়বোয়াল স্কুলে ইনস্পেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে অপুর আবৃত্তি,

‘কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল’। একসময় স্কুলে যাওয়ার পয়সা ছিল না সেই বালকের।

তারই মুখে ‘সে আমাদের বাংলাদেশ,আমাদেরই বাংলা রে’

শুনে ঝাঁটাগুঁফো, ইনস্পেক্টর সাহেবের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

এই স্নিগ্ধ ক্যারিকেচারের মধ্যে দিয়ে যে,দেশের কথা শুনি, তা জাতি-রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নাগরিক কোনও কিশোর নায়কের দেশপ্রেম নয়, দরবারী নাগরিক হতে গিয়ে ক্রমশ যে-দেশ অপসৃত হয়, এ তার বিবৃতি’

‘কাঞ্চণঝঙ্ঘা’ ছবিতে , লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এক অসাধারণ শিল্পীকে দিয়ে গাইয়ে নেবার যথাযথ ভাবনা একমাত্র সত্যজিৎ রায়েই ছিল !

কোলকাতার ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোড। যার বাসিন্দা বেঁচে থাকলে আগামী বছর তাঁর শতবর্ষ উদযাপন হত। কিন্তু আজ উদযাপনের দিন নয়। ২৮ বছর কেটে গিয়েছে তাঁর চলে যাওয়ার।

  সত্যজিৎ রায়

“মহারাজা তোমারে সেলাম”

সত্যজিৎ রায় ১০০ বছরে পা রাখায় তার স্মৃতির সম্মানর্থে এই লিখা।

লিখেছেন অতিতুচ্ছ একজন মানুষ ‘ফাহাদ আল মুক্তাদির’

Previous ArticleNext Article

Most Popular Topics

Editor Picks