আম-ভারতীয় উপমহাদেশ যা উপহার হিসেবে দেয় পুরো পৃথিবীকে

আম। ভারত, পাকিস্তান আর ফিলিপাইনসের জাতীয় ফল, বাংলাদেশের জাতীয় গাছ (সেখানে জাতীয় ফল কাঁঠাল)। আজ এই ২১ শতকে আম চাষ হয় মোটামুটি সারা পৃথিবীতে

কিন্তু আমের আদি নিবাস কোথায়?

অনুমান করা বোধহয় কঠিন নয়। আমের আদি নিবাস উত্তর-পূর্ব ভারত-বাংলাদেশ-বর্মার সঙ্গমস্থলে। আরো চুলচেরা করতে চাইলে আসামে। তারো চেয়ে বেশি চুল চিরলে গারো পাহাড়ের পশ্চিম কোণে

এই এলাকায়। উত্তরে ধুবড়ি জেলা, দক্ষিণে শেরপুর, পূর্বে কুড়িগ্রাম জেলা, পশ্চিমে নক্রেক ন্যাশনাল পার্ক। মাঝে বয়ে চলেছে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র।

আমের এই জন্মস্থল প্রথম নির্নয় করেছিলেন নিকোলাই ইভানোভিচ ভাভিলভ, ১৯২৬ সালে। ১৯৫১ আর ১৯৫৩তে দু’টো গবেষণায় নির্নয়টি আরো শক্তপোক্ত করে প্রতিষ্ঠা করেন সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়। মুখুজ্যে বাবুর মতে এই আসাম-বাংলাদেশ-বর্মার কোণে আম খাওয়া হচ্ছে চার হাজার বছর ধরে। এমনকি সে অঞ্চলে তিনি আদি জাতের বুনো আমের ৫০-৬০টি গাছও নির্নয় করেছেন। উল্লেখ্য, আদি জাতের আম আজকের আমের মতো সুস্বাদু নয়।

১৯৯৮তে মেঘালয়ের দামালগিরিতে রাকেশ মেহরোত্রা আবিষ্কার করেন প্রাচীন আমগাছের ফসিল। ছয় কোটি বছর পুরনো সেই ফসিল। সেই আদিম আমের নাম দেয়া হয়েছে Eomangiferop-hyllum Damalgiriensis।

বাঁয়ে পশ্চিম গারো পাহাড়ে দামালগিরির অবস্থান। ডানে আদি আমের পাতার ফসিল।

ভারতে আম চাষ হচ্ছে প্রায় দু’হাজার বছর ধরে। এমনটাই বলছেন গবেষকরা।

ভগবৎকথায় বলছে একদিন নারদ মুনি মহাদেবকে একটি সোনার আম উপহার দিয়েছিলেন এই বলে যে এই ফল কেবল একজন খাবে। কার্ত্তিক আর গণপতি দু’জনই সেই আম যাঞ্চা করলে ঠিক হলো দু’জনের মধ্যে যে সবার আগে তিনবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারবেন তিনিই খাবেন আম। কার্ত্তিক তিনবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এসে দেখেন গণপতি মা দুর্গাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে বসে আছেন। মা পৃথিবীবৎ এই বিবেচনায় গণেশই আমটি খেয়েছিলেন। তাই গণেশের হাতে ডালিমের বদলে আমও দেখা যায় ভক্ত গণপতি মূর্তিতে।

বাল্মিকী বারবার আমের কথা বলেছেন। জাতকেও আমের কথা এসেছে বারবার। মহাকবি কালিদাস আম্রমুকুলকে মন্মথের পঞ্চশরের একটি শর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারাইকাল আম্মাইয়ার একবার স্বামীর রেখে যাওয়া আম এক শৈবযোগীকে ভিক্ষায় দিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী এসে যখন আম খেতে চাইলেন তখন শিবভক্ত আম্মাইয়ার মহাদেবের কাছেই আম ভিক্ষা করে সংসার রক্ষা করেছিলেন। পৌরানিক ভারত আমে পরিপূর্ণ।

চতুর্থ-পঞ্চম শতকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আম নিয়ে গেলেন মালয় উপদ্বীপ আর ইন্দোচীনে। একশ’ বছরের মধ্যেই সে আম পৌঁছলো ফিলিপাইনসে। সপ্তম শতকে পর্যটক হিউয়েন সাং আম নিয়ে গেলেন চীনে। দশম শতকের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকায় পৌঁছলো আম পারস্যবাসীদের হাতে। ইবনে বতুতা চতুর্দশ শতকে সোমালিয়ার মোগাদিশুতে আম খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এরপর ভারতে পৌঁছলো পর্তুগীজ আর্মাডা। ১৪৯৮ থেকে তারা আম রপ্তানী শুরু করলো, আচার আর বীজ হিসেবে। তার দেড়শ’ বছর পর সম্রাট আকবর দ্বারভাঙায় লাখবাগ বাগিচায় এক লক্ষ আমের চারা রোপন করালেন।

ইউরোপ আর আমেরিকায় আম গেলো পর্তুগীজদের সাথে। ১৫১০ সালে ইটালিতে লুডোভিকো ডি বার্টেম প্রথম ব্যবহার করলেন ম্যাঙ্গো নামটি, যা সম্ভবত এসেছে মালায়লি শব্দ মান্না/মাঙ্গা থেকে (ইনি সেই ব্যক্তি যিনি প্রথম ইউরোপিয়ান হিসেবে কাবায় প্রবেশ করেছিলেন) । ১৬ শতকে আম পৌঁছলো ব্রাজিলে, ১৭ শতকে ক্যারিবিয়ানে, ১৮ শতকে মেক্সিকোতে, আর ১৯ শতকে মার্কিন মুল্লুকে।

আর এখন? আম আছে সারা পৃথিবীতে। আমের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক চীন, আর বৃহত্তম রপ্তানীকারী মেক্সিকো। ভাবা যায়?

আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা আম… (ওপরের সারি, বাঁদিক থেকে) ইটালি, ফ্লোরিডা, জাপান, হল্যান্ড (নিচের সারি, বাঁদিক থেকে) ব্রাজিল, আমিরাত, নাইজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া

Previous ArticleNext Article

Most Popular Topics

Editor Picks