কোরআনে বর্ণিত ইয়াযুজ মাযুজ এখন কোথায় আছে?

আমরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখছি সারাজীবন সবকিছু একভাবে চলবে না। আল্লাহ যেদিন পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন সেদিনই এর পরিনতি লিখে রেখেছেন। আমরা সেই পরিনতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। ইয়াজুয মাজুযকে আল্লাহ হজরত ঈমাম মাহদী আসার পরে এবং দাজ্জালকে হত্যার পরে হজরত ঈসা (আঃ) এর সময়ে বের করবেন।

ইয়াজুয – মাজুয পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র মানুষ,দৈহিক আকৃতিতে তারা হজরত আদম (আঃ) এর চেয়েও বড় ১২০ হাত, তারা দীর্ঘ দিন বেচে থাকে । যারা বর্তমান রাশিয়া বা জর্জিয়ার আশেপাশে আবদ্ধ আছে। আমরা তাদেরকে দেখি না, বিমান বা উপগ্রহ-চিত্রেও তাদের দেখা সম্ভব না, যেহেতু আল্লাহ তাদেরকে গোপন করে রেখেছেন, কেয়ামতের আগে ছেড়ে দিবেন।

ইয়াজুয – মাজুযের দল বের হওয়া কিয়ামতের একটি অন্যতম আলামত । এরা বের হয়ে পৃথিবীতে বিপর্যয় ও মহা ফিতনার সৃষ্টি করবে। এরা বর্তমানে যুল – কারনাইন বাদশা কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরের ভিতরে অবস্থান করছে । কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে তারা দলে দলে মানব সমাজের ভিতরে চলে এসে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালাবে । তাদের মােকাবেলা করা মত শক্তি তখন কোন মানুষের থাকবে না।

(কাল্পনিক ছবি ইয়াজুয ও মাজুয

ইয়াজুয মাজুযের আগমন সম্পর্কে আল্লাহ্ তা ‘ আলা বলেছেনঃ

“ এমন কি যখন ইয়াজুয ও মাজুযকে মুক্ত করা হবে তখন তারা প্রত্যেক উঁচ ভূমি থেকে দলে দলে ছুটে আসবে । যখন সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটবর্তী হবে তখন কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে । তারা বলবেঃ হায় দুর্ভোগ আমাদের ! আমরা তাে ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন ; বরং আমরা ছিলাম যালেম ” । – ( সূরা আম্বিয়া : ৯৬ – ৯৭ )

বাদশাহ জুলকারনাইন তাঁর রাজ্য জয়ের সফরে বের হয়ে এমন এক জাতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যাদের ভাষা বোঝা দুষ্কর ছিল। আকার-ইঙ্গিতে কিংবা কোনো অনুবাদকের মাধ্যমে তারা ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচার থেকে মুক্তির দাবি জানায়। যা পবিত্র কুরআন শরীফ এভাবেই বর্নিত হয়েছেঃ

৯৪- তারা বললো, “হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। আমরা কি তোমাকে এ কাজের জন্য কোন কর দেবো, তুমি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবে?”

৯৫- সে বললো, “আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তাই যথেষ্ট। তোমরা শুধু শ্রম দিয়ে আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে প্রাচীর নির্মাণ করে দিচ্ছি।

৯৬- আমাকে লোহার পাত এনে দাও।” তারপর যখন দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা সে পূর্ণ করে দিল তখন লোকদের বললো, এবার আগুন জ্বালাও। এমনকি যখন এ (অগ্নি প্রাচীর) পুরোপুরি আগুনের মতো লাল হয়ে গেলো তখন সে বললো, “আনো, এবার আমি গলিত তামা এর উপর ঢেলে দেবো।”

৯৭- (এ প্রাচীর এমন ছিল যে) ইয়াজুজ ও মাজুজ এটা অতিক্রম করেও আসতে পারতো না এবং এর গায়ে সুড়ংগ কাটাও তাদের জন্য আরো কঠিন ছিল।

৯৮- যুলকারনাইন বললো, “এ আমার রবের অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে তখন তিনি একে ধূলিস্মাত করে দেবেন আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।

৯৯- আর সে দিন আমি লোকদেরকে ছেড়ে দেবো, তারা (সাগর তরংগের মতো) পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে এবং আমি সব মানুষকে একত্র করবো।[সুরা -কাহফ]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,

হুজায়ফা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইয়াজুজ একটি জাতি। মাজুজ একটি জাতি। প্রত্যেক জাতির অধীনে রয়েছে চার হাজার জাতি। তাদের কোনো ব্যক্তি তত দিন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করে না, যত দিন তারা চোখের সামনে নিজের ঔরসজাত হাজার সন্তান দেখতে না পায়, যাদের প্রত্যেকে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারে সক্ষম। হুজায়ফা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আবেদন জানিয়েছি যেন তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়। তিনি বলেন, তারা তিন ধরনের। তাদের এক দল হবে আরুজের মতো। আরুজ হলো সিরিয়ার একটি বৃক্ষ। এর দৈর্ঘ্য আকাশপানে ১২০ হাত। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এরা এমন জাতি, কোনো ঘোড়া ও লোহা তাদের মোকাবেলায় দাঁড়াতে পারবে না। আর তাদের অন্য আরেকটি দল এক কানের ওপর ঘুমায় এবং অন্য কান মুড়ি দিয়ে থাকে। তাদের পাশ দিয়ে যত হাতি, বন্য প্রাণী, উট ও শূকর অতিক্রম করে, তারা সেগুলো খেয়ে ফেলে; এমনকি তাদের মধ্য থেকে কেউ মরে গেলেও তারা খেয়ে ফেলে…।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ১২৫৭২)

“ইয়াজুয-মাজুয প্রাচীরের ভেতর থেকে বের হওয়ার জন্য প্রতিদিন খনন কাজে লিপ্ত রয়েছে । খনন করতে করতে যখন তারা বের হওয়ার কাছাকাছি এসে যায় এবং সূর্যের আলাে দেখতে পাবে তখন তাদের নেতা বলবেঃ ফিরে চলে , আগামীকাল এসে খনন কাজ শেষ করে সকাল সকাল বের হয়ে যাব । আল্লাহ তা ‘আলা রাতে প্রাচীরকে আগের চেয়ে আরো শক্তভাবে বন্ধ করে দিবেন । প্রতিদিন এভাবেই তাদের কাজ চলতে থাকে । এরপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মেয়াদ যখন শেষ হবে এবং তিনি তাদেরকে বের করতে চাইবেন। তখন তারা খনন করবে এবং খনন করতে করতে যখন সূর্যের আলো দেখতে পাবে তখন তাদের নেতা বলবেঃ ফিরে চলে। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল এসে খনন কাজ শেষ করে সকাল সকাল বের হয়ে যাব । এবার তারা ইনশাআল্লাহ বলবে, অথচ এর আগে কখনও তা বলেনি । তাই পরের দিন এসে দেখবে যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই রয়ে গেছে । অতি সহজেই তা খনন করে মানব সমাজে বের হয়ে আসবে । তারা পৃথিবীর নদী – নালার সমস্ত পানি পান করে ফেলবে । এমনকি তাদের প্রথম দল কোন একটি নদীর পাশে গিয়ে নদীর সমস্ত পানি পান করে শুকিয়ে ফেলবে, পরবর্তী দলটি সেখানে এসে কোন পানি দেখতে না পেয়ে বলবে ? এখানে তাে এক সময় পানি ছিল । তাদের ভয়ে লােকেরা নিজ নিজ সহায় – সম্পদ নিয়ে অবরুদ্ধ শহর অথবা দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করবে। ইয়াজুয – মাজুযের দল যখন পৃথিবীতে কোন মানুষ দেখতে পাবে না তখন তাদের একজন বলবে যমিনের সকল অধিবাসীকে খতম করেছি । আকাশের অধিবাসীরা বাকী রয়েছে । এ বলে তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। রক্ত মিশ্রিত তীর ফেরত আসবে । তখন তারা বলবে জমিনের অধিবাসীকে পরাজিত করেছি এবং আকাশের অধিবাসী পর্যন্ত পেীছে গেছি । এরপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে ‘নাগাফ ‘ নামক এক শ্রেণীর পোকা প্রেরণ করবেন । এতে এক সময়ে একটি প্রাণীর মৃত্যুর মতই তারা সকলেই মারা যাবে । নবী করীম ছালালাত , ওয়াছাল্লাম বলেনঃ “ আল্লাহর শপথ ! তাদের মরা দেহ এবং চর্বি ভক্ষন করে যমিনের জীব – জন্তু ও কীট পতঙ্গ মােটা হয়ে যাবে এবং আল্লাহর শােকরিয়া আদায় করবে ” । –

 

তাদের মরা-পঁচা দেহে এবং দুর্গন্ধে যমিন ভরপূর হয়ে যাবে এবং তাতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে নতুন এক সমস্যার সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়বার আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) আল্লাহর কাছে দু’আ করবেন। আল্লাহ তাঁদের দু’আ কবূল করে উটের গর্দানের মত লম্বা লম্বা এক দল পাখি পাঠাবেন। আল্লাহর আদেশে পাখিগুলো তাদেরকে সাগরে নিক্ষেপ করে পৃথিবীকে পরিস্কার করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা প্রচুর বৃষ্টি বর্ষন করবেন। এতে পৃথিবী একেবারে আয়নার মত পরিস্কার হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা যমিনকে ফসল-ফলাদি উৎপন্ন করার আদেশ দিবেন। যমিন সকল প্রকার ফল ও ফসল উৎপন্ন করবে। ফলগুলো এত বড় হবে যে, একটি ডালিম এক দল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। লোকেরা ডালিমের খোসার নিচে ছাঁয়া গ্রহণ করতে পারবে। দুধে বরকত দেয়া হবে। একটি উটের দুধ সেদিন কয়েকটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে, একটি গাভীর দুধ একটি গোত্রের লোকের জন্য যথেষ্ট হবে এবং একটি ছাগলের দুধ এক পরিবারের সকলে জন্য যথেষ্ট হবে। (মুসলুম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান)

( ইবনে মাযাহ , তিরমিযী , ইবনে হিব্বান ও মুস্তাদরেক হাকেম)

Previous ArticleNext Article

Most Popular Topics

Editor Picks