বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না কেন?

বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না কেন-সহজ কথায় একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেবার কারনে।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করার পর ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতা জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান বানিয়েছিলেন শফিউল্লাহকে সরিয়ে। তাতে নারাজ হয়ে খালেদ মোশাররফ আর শাফায়াত জামিল বিদ্রোহ করে জিয়াকে সরিয়ে গৃহবন্দী করেছিলেন। তখন জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) নেতা আবু তাহের তাকে মুক্ত করে আনেন। খালেদ মোশাররফও খুন হলেন। এবার দেশপ্রধান হলেন জিয়াউর রহমান। খুব দ্রুতই তিনি তার উদ্ধার কর্তা তাহেরকেও মেরে ফেলেন। তারপর একটি সত্যিকার সরকার বানানোর কাজে হাত দেন।

তখন থেকেই শুরু।

প্রথমে জাগোদল. তারপর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট, আর সবশেষে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করলেন জিয়া। সুশীল সমাজের কয়েকেজন সদস্য আর বেশ কিছু ইসলামী নেতাকে নিয়ে গঠিত হলো দল। কিন্তু সে দলের কোনো সমর্থক ছিলো না। থাকার কথাও নয়। কারন সদস্যরা প্রায় কেউই জননেতা ছিলেন না। তাতে অসুবিধে হয়নি। জিয়াউর রহমানের সেনা শাসনের সময়ে প্রতিটি নির্বাচনেই বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতে এগিয়ে গেলেন জিয়া, সাথে টেনে নিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে লড়ােই করা ইসলামী দলগুলো। বিশেষ করে জামাতে ইসলামীকে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটিকে ফের রাজনীতি করতে দিলেন, দেশে ফেরত আনলেন তাদের আমীর যুদ্ধপরাধী গোলাম আজমকে। সেটাই স্বাভাবিক। সোভিয়েতপন্থী ভারতের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার ছিলো পাকিস্তান, তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা তারা চায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশেকে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই ফের পাকিস্তান বানাবার লক্ষ্যে তাদের প্রধান হাতিয়ার হলেন জিয়াউর রহমান।

ভারত সফরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া

জিয়াও একসময়ে খুন হলেন। ক্ষমতায় এলেন হোসেন মোহম্মদ এরশাদ। আবার সামরিক শাসন। এবার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেন খালেদা জিয়া, সাথে বিএনপি। একই মাঠে নামলেন শেখ হাসিনা, ততদিনে দেশে ফিরে তিনি দলের হাল ধরেছেন। জিয়ার সামরিক শাসনের কথা অনেক মানুষের মনে ছিলো তখনো। তাই আরেকটা সামরিক শাসন কেউ চায়নি।

আওয়ামী লীগ আর বিএনপি তখন এক কাতারে। দেশের মানুষ তাদের পেছনে দাঁড়ানো। শেখ হাসিনা বরং একবার এরশাদের সময়ে নির্বাচনে গিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা কখনো আপোষ করেননি। তাই তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিলো আপোষহীন নেত্রী। তিনি কিভাবে কাঁটাতার দেয়া দেয়াল টপকে পুলিশের হাত থেকে বেঁচে গেছেন জাতীয় গল্প মুখে মুখে ঘুরতো।

তারেক রহমানের বিয়ের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা

এরশাদ সরকারের টাকা ফুরিয়ে গেলো। ব্যপক লুটতরাজের ফলে তাঁর শাসনের শেষ মাসে সরকারী কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছিলো বিদেশ থেকে পাকা ধার করে। জনআন্দোলনের মুখে সরকার চালু রাখার ক্ষমতা তার আর ছিলো না। তিনি পদত্যাগ করলেন। এবং জেলে গেলেন। দেশে প্রথম সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচন হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

নির্বাচনের আগে শেষ ভাষণে শেখ হাসিনাকে দেখে মনে হলো তিনি নির্বাচনে জিতেই গেছেন। দেশের মানুষ সেটা পছন্দ করলো না। শেখ মুজিবের সময়ে যেসব জুলুম হয়েছিলো সেগুলোও মানুষের মনে ছিলো। তাই তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে বেশি উৎসাহী হলো না। বিরাটভাবে বিএনপি জিতলো। সাইফুর রহমানকে অর্থমন্ত্রী করে দেশের অর্থনীতিকে আবার সচল করলো বিএনপি সরকার।

এরপরই প্রথম বড় ভুল। পরের নির্বাচনের সময়ে সকল বিরোধীদল, আওয়ামী লীগ, জামাত ও এরশাদের জাতীয় পার্টি একসাথে চাইলো দলীয় সরকার নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচন করতে। নারাজ বিএনপি একা একা নির্বাচন করে ৩০০ আসন পেলো। কিন্তু সেই বিরোধীদল বিহীন সরকার টিঁকলো মাত্র ১২ দিন।

বলাই বাহুল্য নিবার্চনে জিতলো আওয়ামী লীগ। সাদামাটা পাঁচবছর কাটলো তাদের শাসনে। তারপর ফের এলো বিএনপি। সবাই ধরেই নিলো যে এভাবেই চলবে। একবার আওয়ামী লীগ, আরেক বার বিএনপি।

কিন্তু ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সেই সাইক্লিক অর্ডার ভাঙার চেষ্টা নিযুক্ত হলো। বিশেষভাবে জমে উঠলো ২০০৪ সাল। আওয়ামী লীগের মিটিঙে গ্রেনেড মেরে, শেখ হাসিনাকে গুলি করে শেষ করার চেষ্টা হলো। সরকারের মদতে সারা দেশে ৫০০ বোমা ফাটালো জঙ্গী সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা। ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়লো চট্টগ্রাম থেকে আসাম যাবার পথে। পাশাপাশি তারা মতিউর রহমান নিজামি সহ আরো যুদ্ধাপরাধী ও ইসলামি নেতাকে মন্ত্রী বানালো।

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, যা কিনা বেনজির ভুট্টো হত্যার মতোই একটি চেষ্টা ছিলো

এত বাড়াবাড়ি পছন্দ করলো না সেনাবাহিনী। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পুতুল সরকার বানিয়ে এক বছর রাজনীতিকদের চাপে মধ্যে রাখার পর ফের এলো নির্বাচন ২০০৮-এ। ২৩০ আসন পেলো আওয়ামী লীগ, ৩০ আসন বিএনপি আর ২৭টি এরশাদের জাতীয় দল। বোঝাই গেলো যে কেবল সেনাবাহিনী নয়, সাধারণ মানুষও বিএনপির বাড়াবাড়ি পছন্দ করেনি। ওদিকে বাড়াবাড়িতে মন দেবার ফলে দেশের অর্থনীতির তখন নাভীশ্বাস। বিদ্যুৎ নেই, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। দেশ টিঁকে আছে কেবল মানুষের মনের জোরে।

আল কায়দা টাইপ সংগঠনের সাথে জড়িত হয়ে ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারিয়েছে বিএনপি, ভারতবিরোধী জঙ্গীদের সাহায্য করে হারিয়েছে ভারতের সমর্থন। দেশে বিদেশে কোথাও বিএনপির মানসম্মান তেমন ছিলোনা তখন। ওদিকে আওয়ামী লীগের হাতে তখন সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা এসে গেছে। সংশোধনও তারা করে নিলো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলো আওয়ামী লীগ। আর সেই বিচারের দাবীতে বিশাল জনসমুদ্র পথে নামলো। সন্ত্রাসবাদের দায়ে অভিযুক্ত জিয়াপুত্র তারেক রহমানকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলো। সে সময়ে তারেকই ছিলো বিএনপির ভবিষ্যৎ।

শাহবাগ আন্দোলন, যাতে বিএনপি সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়েছে

আর সবচেয়ে বড় কথা এই যে শেখ হাসিনার সরকার দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে ফেললো। ২০১৩তে বিএনপিও পথে নামলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। তারা ভুলেই গিয়েছিলো যে সেটা ১৯৯৬ সাল নয়। আন্দোলন প্রথমেই বানচাল হবার যোগাড় হলো যখন পরিবহন মালিক আর শ্রমিক তাদের হরতাল উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো। বাড়াবাড়িতে অভ্যস্ত বিএনপি চারিদিকে বাস পোড়াতে শুরু করলো। পুড়ে মারা গেলো নিরীহ অনেক মানুষ। নির্বাচনে ফের জিতলো আওয়ামী লীগ। আরো ৪টি আসন বেশি জিতলো তারা।

অব্যহত রইলো অর্থনীতির অগ্রযাত্রা। ওদিকে ইসলামি জঙ্গীদের কঠোর হাতে দমন করা হলো। আইসিস এবং আল কায়দা রুখে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের নয়নমণি হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা। ওদিকে ভারতবিরোধী জঙ্গীদের গ্রেপ্তার করে ভারতে পাঠিয়ে দিয়ে সেদেশের সাথেও সম্পর্কের অনেক উন্নতি হলো। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে জাতিসংঘেরও প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠলেন হাসিনা। হাজার বিএনপি নেতাকর্মী জেলে গেলো খালেদা জিয়াসহ। আরেক জিয়াপুত্র কোকোও মারা গেলেন (না, তিনি খুন হননি)।

বাংলাদেশের উন্নতির একটি চিত্র, এমন হাজার চিত্র রয়েছে

বিএনপির আশ্রয় হলো মীর্জা ফখরুল আর খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মতো অযোগ্য নেতাদের হাতে। এছাড়া বিএনপির আর কোনো উপায়ও ছিলোনা। একে তো প্রথম থেকেই দলে কোনো জননেতা ছিলো না। তারওপর যে দু’চারটে নেতা জোগাড় করতে পেরেছিলো তারা সবাই জেলে। নতুন নেতা নেই কোনো। মাঠ পরা্য়ের দায়ীত্ব তারা দিয়েছিলো জামাতকে। সেই জামাতও নিষিদ্ধ। চিরকাল খুঁটির জোর ছিলো সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীও এখন রাজনীতি বিমুখ। এ যেন আত্মবিধ্বংসী ভুলের এক লম্বা তালিকা।

যতদিন যাচ্ছে ততই বিলুপ্ত হচ্ছে বিএনপি। যারা এখন নতুন ভোটার তারা বিএনপির নাম শুনেছে ইতিহাসের অংশ হিসেবে। সত্যিকার দল হিসেবে নয়। আওয়ামী লীগ আরো একটা টার্ম শাসন করলে বিএনপি পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে বলেই ধারনা করি।

Previous ArticleNext Article

Most Popular Topics

Editor Picks